Daily Bangladesh
  1. অর্থনীতি
  2. আন্তর্জাতিক
  3. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  4. খেলাধুলা
  5. জাতীয়
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. পাঠক মতামত
  8. ফিচার
  9. বিজ্ঞান ও গবেষণা
  10. বিনোদন
  11. ব্যবসা ও বানিজ্য
  12. রাজনীতি
  13. লাইফস্টাইল
  14. শিক্ষা
  15. সাহিত্য ও সংস্কৃতি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

প্রযুক্তি নির্ভর যুগে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী কেন মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে?

Link Copied!

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের চিন্তা শক্তি এবং জ্ঞানের দিগন্ত প্রসারিত করা। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবীতেই মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় শুধু ডিগ্রি অর্জন করার জন্য। যার সাহায্যে তারা একটি ভালো চাকরি পেতে পারেন। আধুনিক যুগের বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম মানুষকে না প্রকৃত জ্ঞান চর্চার সুযোগ দিচ্ছে, না চাকরির জন্য দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারছে। সে কারণেই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রীকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন।

শুধু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সমগ্র পৃথিবীর শীর্ষ স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই বর্তমান মানবজাতির প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে আসতে পারছেনা। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। সফল এই উদ্যোক্তা আরো মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় শুধু তদারকি করে শিক্ষার্থীরা সময়মতো তাদের এসাইনমেন্ট শেষ করতে পারছে কিনা। ছাত্রছাত্রীরা বিষয়গুলো ভালভাবে শিখছে কিনা তা এখানে মুখ্য বিষয় নয়। ইলন মাস্ক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় হল সমবয়সীদের একসাথে মিলেমিশে মজা করার জায়গা’। অথচ তাদের এই সময়টাতে সরাসরি কোন কাজে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।

সিলিকন ভ্যালির কিংবদন্তি বিনিয়োগকারী এবং পেপালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পিটার থিল মনে করেন, সকল ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় বর্জন করা উচিত। কারণ উচ্চশিক্ষা মূলত এক ধরনের ব্রেনওয়াশিং। ইউনিভার্সিটির ড্রপ আউট বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে যারা নিজের কোম্পানি তৈরি করছে তাদেরকে পিটার থিল একটি ফেলোশিপ প্রদান করেন। এই ফেলোশিপের উদ্যোক্তাদের এক লক্ষ ডলার বা ৮৫ লক্ষ টাকা প্রদান করা হয়।

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানি অ্যাপলে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রীর চেয়ে কর্মীর দক্ষতা কে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক জানান, অ্যাপলের কর্মীদের অর্ধেকেরই চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী নেই। এমনকি অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছিলেন মাত্র এক সেমিস্টার। স্টিভ জবস এর মতো আরো বহু সফল উদ্যোক্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা বাদ দিয়েছিলেন। বলতে গেলে তারাই আজকের বিশ্ব ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে।

মাইক্রোসফট এর প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা ছেড়ে নিজের কোম্পানি তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছিলেন। ফেসবুকের উদ্যোক্তা মার্ক জাকারবার্গ ও হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা বাদ দিয়ে ছিলেন। ড্যানিয়েল এক সুইডেনে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া বাদ দিয়ে স্পটিফাই প্রতিষ্ঠা করেছেন।

যারা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে নিজের কোম্পানি গড়ে তুলেছেন ইলন মাস্ক তাদের তারিফ করেন। এমনকি তিনি নিজেও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে গিয়ে মাত্র দুই দিন পরেই পিএইচডি ছেড়ে দেন। তার চেয়েও মজার বিষয় হলো ইলন মাস্ক বলেছেন তার সাথে কাজ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী বাধ্যতামূলক নয়। তার পরিচালিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে স্পেস এক্স, টেসলা, নিউরালিনক, বোরিং কোম্পানির মতো বেশ কয়েকটি বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর শীর্ষ কোম্পানি রয়েছে।

আরো পড়ুন: হা লং উপসাগর: পৃথিবীর এক প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য

করোনা মহামারির মধ্যে গুগোল তাদের নিজস্ব ‘গুগল ক্যারিয়ার‘ নামে একটি অনলাইন স্কুল খোলার ঘোষণা দিয়েছে। গুগলের এই স্কুলে ডাটা এনালাইসিস, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট এবং ইউজার এক্সপেরিয়েন্স ডিজাইন কোর্স শেখানো হবে। এই কোর্সগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। গুগলে চাকরির ক্ষেত্রে মাত্র ছয় মাসের এসব অনলাইন কোর্স চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির সমান মর্যাদা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। গুগলের ছয় মাসের অনলাইন কোর্স করতে একজন শিক্ষার্থীর খরচ হবে মাত্র ২৩৪ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা ২০ হাজার টাকা মাত্র। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের বই খাতাসহ শিক্ষা উপকরণ কিনতেই এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ হয়ে যায়। গুগলের কোর্সধারীরা প্রতি মাসে সাড়ে চার লাখ টাকা এবং বছরে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা বেতনের চাকরির সুযোগ পাবে।

বর্তমান চাকরির বাজারে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তার খুব কম বিষয় পড়ানো হয়। আমরা মনে করি আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থা অনেক উন্নত। তাই তাদের বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েটরা তাই হয়তো অনেকেই এগিয়ে থাকে। কিন্তু বিষয়টি মোটেও সে রকম নয়। ডিজিটাল টেকনোলজি সমস্যা সমাধানে আমেরিকার অবস্থান ১৮তম। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে ফিনল্যান্ড, সুইডেন এবং সিঙ্গাপুর। গাণিতিক সমস্যা সমাধানে আমেরিকার অবস্থান ২৭ তম। এক্ষেত্রে শীর্ষ দেশগুলো হলো জাপান, ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন।

একাধিক ভাষায় দক্ষতা মানুষকে চাকরির বাজারে যেমন এগিয়ে রাখে, ঠিক তেমনি ভাবে কোডিং-এর দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তি কে শীর্ষ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চাকরির ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়। কারণ কোডিংয়ের জ্ঞান মানুষের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ায়। অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক মনে করেন হাই স্কুলের লেখাপড়া শেষ করার আগে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কোডিং শেখা উচিত।

শিশু শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সবাইকে কোডিং শেখার জন্য ২০১৬ সালে আপোল একটি প্রোগ্রাম চালু করেছিল। বর্তমান বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা প্রযুক্তি দানব প্রতিষ্ঠানগুলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল কোন না কোন কোডিং জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে। বর্তমানেও কোডিং শিখে এমন সব চাকরি পাওয়া সম্ভব যা বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী দিয়ে কখনই অর্জন করা সম্ভব নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি বেশিরভাগ দেশেই অনেক ব্যয়বহুল। আমেরিকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গড়ে প্রায় ৩২ লক্ষ টাকা খরচ হয়। বাংলাদেশেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে কমপক্ষে ৫ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র প্রতি বছরে এক থেকে দেড় লাখ টাকা সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হয়। সেকারণে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার খরচ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় ১৯ গুণ বেশী।

এছাড়াও তথাকথিত প্রধান সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার খরচ আকাশচুম্বী। এই বিপুল অর্থ যোগান দিতে বাংলাদেশি অভিভাবকদের নাভিশ্বাস উঠে যায়। অন্যদিকে আমেরিকানরা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ এডুকেশন লোন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে এবং পরবর্তীতে এসব ঋণ পরিশোধ করতেও গ্রাজুয়েটদের হিমশিম খেতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী বিপক্ষে নানান মত থাকলেও এখনও পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার অনেক কারণ অবশিষ্ট আছে। বহু বিষয়ে গবেষণার জন্য এখনও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। বিশ্বব্যাপী এই আলোচনা তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা বাদ দেয়ার জন্য নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিতে আরো যুগোপযোগী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।

বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী অপ্রাসঙ্গিক হবার পেছনে বিশ্বের শীর্ষ নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় কে দায়ী করা হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাতো যাচ্ছেতাই। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় ঢাকা শহরের পাড়া-মহল্লায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এগুলোতে শিক্ষার মান তলানীতে গিয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশ্বের শীর্ষক ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেও নেই।

এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন কলেজে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করলেও খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এর মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী গ্রাজুয়েশন শেষে সরকারি চাকরি বা বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। মজার ব্যাপার হলো বিসিএস এর জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা কোন কাজে আসে না। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী গ্রাজুয়েটদের কে চাকরিও দিতে পারে না আবার উদ্ভাবক, উদ্যোক্তাও তৈরি করতে পারছে না। সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী এক ধরনের আলংকারিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যার ফলে বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে।