Daily Bangladesh
  1. অর্থনীতি
  2. আন্তর্জাতিক
  3. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  4. খেলাধুলা
  5. জাতীয়
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. পাঠক মতামত
  8. ফিচার
  9. বিজ্ঞান ও গবেষণা
  10. বিনোদন
  11. ব্যবসা ও বানিজ্য
  12. রাজনীতি
  13. লাইফস্টাইল
  14. শিক্ষা
  15. সাহিত্য ও সংস্কৃতি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চীনের অর্থনৈতিক উত্থান; অতীত থেকে বর্তমান

Link Copied!

আজ থেকে মাত্র ৪০ বছর পূর্বে ১৯৭৮ সালেও চীন বিশ্বের টপ ৮টি ইকোনমির লিস্টেও ছিল না। বর্তমানে চীন পিপিপি বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি দিক থেকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং নমিনাল জিডিপির দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। এছাড়া ১.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে চীন পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ হওয়ার পাশাপাশি আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশ।

বিশাল হিউম্যান রিসোর্স, লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমি, রিসোর্সের যথাযথ ব্যবহার এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির অন্যতম সুপারপাওয়ার হয়ে উঠেছে। তবে চাইনিজ অর্থনীতির আধিপত্য একদিনে শুরু হয়নি। বরং আজ থেকে ২০০০ বছর আগেও চীন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ছিল। সে সময় অবশ্য সর্ববৃহৎ অর্থনীতি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ।

চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের যাত্রা

খ্রীস্টপূর্ব ২০৭০ সালে অর্থাৎ এখন থেকে ৪ হাজারেরও বেশি বছর পূর্বে কিংবদন্তি শিয়া রাজবংশ এর শাসনকাল থেকেই চীনে রাজবংশীয় পদ্ধতি চালু হয়। এই রাজবংশ খ্রীস্টপূর্ব ১৬০০ অব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। পরবর্তীতে শাং রাজবংশ ও ওয়েস্টার্ন ঝাউ রাজবংশ এর মত আরো বেশ কিছু রাজবংশ চায়না শাসন করে। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৭১ অব্দে ওয়েস্টার্ন ঝাউ রাজবংশের পতন ঘটলে ‘Spring and Autumn period‘ শুরু হয়। সে সময় বেশ কিছু বড় বড় শহর তৈরি হয় যা প্রাচীন চাইনিজ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।

বিভিন্ন স্টেট এ পণ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে বড় ধরনের বাণিজ্যের শুরু হয়। খ্রীস্টপূর্ব ২২১ অব্দে কিন রাজবংশের শাসনামলে ইম্পেরিয়াল সিস্টেমের প্রচলন হয়। এই রাজবংশের সময় চীন প্রথম একটি কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত দেশ হয়ে ওঠে। খ্রীস্টপূর্ব ২০৬ অব্দে কিন রাজবংশের পতনের পর বিখ্যাত হ্যান রাজবংশের শাসনামল শুরু হয়। যাকে চীনের গোল্ডেন এজ বা সোনালি সময় বলা হয়ে থাকে। বিখ্যাত সিল্ক রোডের মাধ্যমে সে সময় চীন বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতৃত্ব করতে থাকে।

৯৬০ খ্রীস্টাব্দে কিংবদন্তি সং রাজবংশ চীন শাসন শুরু করে। সং রাজবংশর পতনের পর ১২৭১ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত ইউয়ান রাজবংশ, মিং রাজবংশ এবং চীনের সর্বশেষ রাজবংশ, কুইং রাজবংশ চীন শাসন করে। সেসময় কৃষি ও শিল্পখাতে প্রযুক্তির বেশ অগ্রগতি হয়। বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ওয়াংজু ও শেংহাই বন্দর বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

China

১৮২০ সালে প্রথম শিল্পবিপ্লবের সময় বিশ্ব অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশ ছিল চায়নার অধীনে। যা ছিল ইউরোপের সে সময়ের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি ব্রিটেনের ৬ গুণ এবং আমেরিকার ২০ গুণের সমান। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় শিল্পবিপ্লব ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতিতে চায়নার আধিপত্য ২০ শতাংশেরও নীচে নেমে আসে।

১৯১২ সালে রিপাবলিক অব চায়নার অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। ১৯১৩ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত চীনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং বিক্ষোভ লেগেছিল। তবে ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে এবং চাইনিজ প্রোডাক্টগুলোর চাহিদা বাড়তে থাকলে চীনের ইন্ডাস্ট্রিগুলো বেশ লাভবান হয়।

১৯২৭ থেকে ১৯৩১ সালে চায়নার ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপ করতে থাকে। তবে ১৯৩০ এর দশকে গ্রেট ডিপ্রেশন বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হানে। এই ডিপ্রেশনের ফলে চীনের স্থানীয় অর্থনীতি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শস্য আমদানি অধিক হারে বৃদ্ধি পেলে কৃষিজ পণ্যের মূল্য কমতে শুরু করে এবং চীনের স্থানীয় ইনকাম কমে যায়।

১৯৩৭ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপান চীন আক্রমণ করে দেশের সকল উৎপাদনশীল অঞ্চল ধ্বংস করে এবং অন্যান্য শহরগুলোতে ধ্বংসযোগ্য চালালে দেশটির পুরো অর্থনীতির পতন ঘটে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে স্টাডি অন দি পপুলেশন অব চায়না থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিলিয়ন চাইনিজ মারা যায়।

যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চীন সরকার যুদ্ধ বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করে। যদিও সেসময় বেশিরভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং পাওয়ারপ্ল্যান্টি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল এবং একটি মাইনও কার্যকর ছিলো না। এর পাশাপাশি চাইনিজ ন্যাশনাল পার্টির দূর্নীতি, জনসাধারণের মৃত্যু, অধিক হারে মুদ্রাস্ফীতি দেশজুড়ে অসন্তুষ্টির সৃষ্টি করে। সেসময় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি গ্রামাঞ্চলে মানুষের মধ্যে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করলে জনগনের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে এবং ১৯৪৯ সাল নাগাদ জাতীয়তাবাদীরা পতিত হতে শুরু করে।

যার ধারাবাহিকতায় সে বছরেরই অক্টোবর মাসে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি বেইজিং ও নেঞ্জিং এর সম্পুর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট লিডার মাও জিডং-এর হাত ধরে ‘People’s Republic of China’ বা ‘কমিউনিস্ট চায়না’র যাত্রা শুরু হয়। কমিউনিস্ট বিপ্লব এর পরেও তেমনভাবে দেশটির উন্নতি করা সম্ভব হয়নি। চীন মূলত সোভিয়েত কমিউনিস্ট মডেল অনুসরণ করে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি তৈরি করার চেষ্টা করছিল।

সমাজতান্ত্রিক এর শুরুর বছরগুলোতে সরকার অর্থনৈতিক সেক্টরের বেশিরভাগই জাতীয়করণ করে। এরপরে প্রাক্তন রাষ্ট্রায়ত্ত এন্টারপ্রাইজ বেশির ভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং পরিবহন সিস্টেমকে জাতীয়করণ করা হয়। ‘The People’s Bank of China’ এর অধীনে ব্যাংকিং সিস্টেমকে জাতীয়করণ করা হয়। তখনও চীন ক্লোজড অর্থনীতি ধরে রাখার ফলে কোন কর্পোরেশনেরই স্বাধীনভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশ নেওয়ার অনুমতি ছিলো না। দেশটির সরকার সরাসরি কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম এবং বৈদেশিক বাণিজ্য দেখাশোনা করত।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে সোভিয়েত কমিউনিস্ট সিস্টেমটি ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সালের জন্য করা চীনের ‘First Five-Year Plan (1953–1957)‘ এর মাধ্যমে চাইনিজ অর্থনীতিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত দেশটির শিল্প উৎপাদন গড়ে ১৯% হারে বৃদ্ধি পায় এবং জাতীয় আয় বছরে ৯% হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৫৬ সালের মধ্যে দেশটির ৬৭.৫% শিল্প প্রতিষ্ঠানিক এন্টারপ্রাইজ রাষ্ট্রমালিকানাধীন এবং ৩২.৫% পাবলিক প্রাইভেট মালিকানাধীন হয়ে ওঠে।

কৃষি সেক্টরও সমাজতান্ত্রিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে যায়। বেশিরবাগ খামারগুলো ব্যাক্তি মালিকানার বদলে যৌথ মালিকানায় পরিণত হয়। ১৯৫৭ সালের মধ্যে ৯৩.৫% কৃষি পরিবার উন্নত উৎপাদনকারী সমবায়ে যুক্ত হয়ে যায়। তবে সেসময় চীনে শিল্প এবং কৃষিজ বৃদ্ধিতে অসামঞ্জস্যতা, অদক্ষতা, অসন্তোষ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নমনীয়তার অভাব ছিল।

মাও জিডল বুঝতে পারেন কেন্দ্রীয়করণ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্ভর সোভিয়েত কমিউনিস্ট মডেল চায়নার জন্য উপযুক্ত নয়। ফলশ্রুতিতে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সালের দ্বিতীয় পাঁচ বছর পরিকল্পনায় সরকার ‘The Great Leap Forward‘ নামে একটি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সচেতনতা পরিচালনা করে। যেখানে অর্থনীতিতে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দেশটির সরকার সকল সেক্টরেই দেশের সম্পূর্ণ জনসংখ্যাকে কাজে লাগায়।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে বিশ্বের শীর্ষ ধনী দেশ চীন

কৃষিখাতের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে কৃষি এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করার জন্য দেশটির সরকার গ্রামাঞ্চলের জনগনকে লো টেক ইক্যুইপমেন্ট প্রোডাকশন ফ্যাক্টরিগুলোতে নিয়োগ দেয় এবং প্রথম বছরেই ক্যাম্পেইনটি সফলতা পায়। ১৯৫৮ সালে এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল আউটপুট ৫৫% বৃদ্ধি পায়। কৃষিজ উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে।

কিন্তু পরবর্তী দু’তিন বছরে সম্পদের অপপ্রয়োগ, দারিদ্রতা জল নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষিখাতে উৎপাদন ব্যাপকহারে কমতে থাকে। ১৯৫৯ সালে ১৪% এবং ১৯৬০ সালে ১৩% হারে কৃষিজ উৎপাদন কমে যায়। ফলে দুর্ভিক্ষ শুরু হয় যাতে প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ মারা যায়। যার প্রেক্ষিতে শিল্প উৎপাদনও ১৯৬১ সালে ৩৮% এবং ১৯৬২ সালে ১৬% হারে কমে যায়। পরবর্তী কয়েক বছরে দেশটির অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার উৎপাদনকে পুনঃকেন্দ্রীয়করণ, হাল্কা ও ভারী ইন্ডাস্ট্রির আগে কৃষিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার মত বেশ কিছু নীতিগত পরিবর্তন আনে।

চীনের অর্থনৈতিক উত্থান

১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত কৃষিখাতে উৎপাদন প্রতি বছর গড়ে ৯.৬% হারে বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদনও গড়ে ১০.৬% হারে বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত দেশটির অর্থনীতি বেশ দ্রুত ঠিক হয়ে করে। শিল্প উৎপাদনও ১৯৭৭ সালে ১৪% এবং ১৯৭৮ সালে ১৩% হারে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু দেশটির ইকোনমিক আউটপুটের একটি বড় অংশ সরাসরি সরকার নিয়ন্ত্রিত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনের উদ্দেশ্য ঠিক করা, দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ করা এবং অর্থনীতির একটি বড় অংশের সম্পদ বণ্টন করাও তখন পর্যন্ত সরকার নিয়ন্ত্রণ করত।

১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রায় ৩ দশক পরেও চীনের অর্থনীতি তখনও তার ঐতিহাসিক অবস্থানের তুলনায় অনেক নিচে ছিল। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টির সুপ্রিম লিডার ডেং শিয়াওপিং ক্ষমতায় আসেন। সেসময় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিংগাপুর, তাইওয়ান এবং হংকং এর মত এশিয় দেশগুলো আমেরিকা এবং ইউরোপের আধুনিক প্রযুক্তির সাথে প্রতিযোগিতা করছিলো। এইদিকে তখনও চীন খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান এর মত মৌলিক চাহিদাগুলো নিয়ে সংগ্রাম করছিলো।

১৯৭৮ সালের ডেং শিয়াওপিং এর নেতৃত্বে চীনের অর্থনৈতিক সিস্টেমের সংস্কার শুরু হয়। তিনি চীনের কমিউনিজম সিস্টেম একেবারে বাতিল না করে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে এনে বাজারজাত প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করেন। প্রথমে আবাদি জমি আংশিক বেসরকারিকরণের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই পদ্ধতিতে জমির মালিকানার পরিবর্তে জমি ব্যবহারের অধিকার দেওয়া হয়। মানুষজন তাদের এই জমি ব্যাবহারের অনুমতিতে কেনা বেচা ও করতে পারত।

কেন্দ্রীয় সরকার কৃষকদের কিছু মূল্য এবং মালিকানা ভাতা দিত এবং ওপেন মার্কেটে তাদের উৎপাদিত ফসলের একটি অংশ বিক্রি করার অনুমতি দিয়েছিলো। ফলে কৃষকরাও বেশি বেশি শস্য উৎপাদন করতে শুরু করে এবং অতিরিক্ত শস্য বাজারে বিক্রি করতে থাকে।

১৯৭৯ সাল নাগাদ দেশটির কৃষিজ উৎপাদন ২২% এর বেশি বৃদ্ধি পায়। এই সময়কালে প্রথমবারের মতো দেশটির বেসরকারি ব্যবসাগুলো তাদের কার্যক্রম শুরু করার অনুমতি পায় এবং দাম নমনীয়তাও বৃদ্ধি পায়। ১৯৮৫ সালে চায়নার স্টেট কাউন্সিল ‘System of National Accounting (SNA)’ প্রবর্তন করে যার ফলে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে জিডিপি হিসাব করা শুরু হয়।

সরকার শিল্প প্রতিষ্ঠান ও সার্ভিস ব্যবসাগুলোতে যৌথ মালিকানা গ্রহণ করা শুরু করে যাতে বেকার জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে হাল্কা প্রাতিষ্ঠানিক উৎপাদ তৈরি করা যায়। এর পাশাপাশি শহরগুলোতে মুচি, দর্জি ও খুচরা বিক্রেতাদের মত ছোট ছোট ব্যবসা তৈরি হতে শুরু করে।

১৯৮৫ সালে চীনের ১৭% ওয়ার্কফোর্স বিভিন্ন টেক্সটাইল মিল, স্টিল মিল, কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার প্ল্যান্ট, পেট্রোকেমিক্যাল ফাসিলিটিস এবং কিছু কনজিউমার গুডস প্রস্তুতকারী ছোট ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করত। যেগুলো দেশটির জিএনপি তে ৪৬% অবদান রাখত। অন্যদিকে কৃষিখাতে ৬৩% ওয়ার্কফোর্স কাজ করত যা দেশটির জিএনপি তে ৩৩% অবদান রাখছিলো।

১৯৮৭ সাল নাগাদ চীন আধুনিক ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্য শুরু করার জন্য চীন সরকার বৈদেশিক ফার্মগুলোর সাথে সরাসরি আলাপ-আলোচনা করার পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল এক্সপোর্ট আরো সহজ করতে ট্রেডিং এবং ক্রেডিট ম্যানেজমেন্ট পলিসি সংশোধন করে। এর পাশাপাশি বেশ কিছু সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল এবং শহরকে ফ্রি মার্কেট হিসেবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য ওপেন সিটি এবং ডেভেলপমেন্ট জোন হিসেবে বিভক্ত করা হয় এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে আকর্ষণ করার জন্য টেক্স ও ট্রেড সুবিধা দেওয়া হয়।

১৯৬৯ সালে চীনের এক্সপোর্ট ও ইম্পোর্ট এর একত্রিত মূল্য ছিলো জাতীয় আয়ের ১৫% যা ১৯৮৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫% এ। ১৯৯০ সালে চায়নায় ২টি স্টক এক্সচেঞ্জ শেনংহাই ও শেঞ্জেন এর কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯২ সালে চাইনিজ নিউ ইয়ারে সাউদার্ন চায়না ভিজিটের সময় ডেনজউ পিং অর্থনৈতিক সংস্কারকে আরও উন্নত করতে ১৯৯০ দশকের জন্য ১০ বছরের ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান ঘোষণা করেন। এই নীতিটির মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি গঠন করা যা চীনের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।

যার প্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালে যেখানে চীনের পার ক্যাপিটাল জিডিপির পরিমাণ ছিলো মাত্র ৯৮২ ডলার। সেখানে ১৯৯৯ সালে ১.২৫ বিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে চীনের পার ক্যাপিটাল জিডিপির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬৫৩ ডলার।

১৯৯৭ সালে ডেনজউ পিং এর মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারী জিয়ান জেমিং এবং জুডংজি এই সংস্করণ কার্যক্রম চালিয়ে যান। ১৯৯৭ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বেসরকারিকরণ চলতে থাকে। ২০০০ দশকের প্রথমার্ধে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এন্টারপ্রাইজ এর পরিমাণ ৪৮% কমে যায়। কিন্তু বিদ্যুৎ, পেট্রোলিয়াম, টেলিকমিউনিকেশন এবং এভিয়েশনে সরকার তখনও মনোপলি ধরে রেখেছিলো।

চীনের অর্থনৈতিক উত্থান

২০০১ সালে চীন ব্যবসায়ের জন্য ট্যারিফ বাণিজ্য বাধা এবং প্রবিধান কমিয়ে দেয় ও ‘বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)‘ এর সাথে যুক্ত হয়। ১৯৯০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত চীনের অর্থনীতি গড়ে ১০% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছিলো যা সেসময়কার অন্য যেকোন দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির তুলনায় বেশি। ২০০৫ সালে চীনের প্রাইভেট সেক্টর জিডিপি অবদানে ৫০% ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।

২০০৬ সালে চায়নার সর্বমোট বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ১.৭৬ ট্রিলিয়ান ডলারে যা দেশটিকে আমেরিকা এবং জার্মানির পর তৃতীয় সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক জাতি করে তোলে। এরপর থেকেই চীন মূলত অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্রমান্বয়ে উন্নত করে আসছিল। শ্রমিকের মজুরি কম হওয়ার ফলে বড় বড় কর্পোরেশনগুলোর জন্য চীন একটি আকর্ষণীয় উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

২০০০ এর দশকে ইলেকট্রনিক্স প্রোডাক্ট উৎপাদনের দিক থেকে চীন বিশ্বনেতা হয়ে ওঠে। এছাড়াও টেকনিক্যাল শিক্ষার মাধ্যমে প্রশিক্ষিত ওয়ার্কফোর্সের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিতে থাকে দেশটি।

যার প্রেক্ষিতে লেনেভো, হায়ার, হুয়াওয়ের মত উদ্ভাবনী কোম্পানিগুলো গড়ে ওঠে এবং বিশ্বের টেক ইন্ডাস্ট্রিতে ভাঙন আনতে শুরু করে। এছাড়া ইন্টারনেট ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চীনের আলীবাবা, বাইডু, টেনসেন্ট, জেডি-এর মত প্রতিষ্ঠানগুলো আমেরিকার টেক জায়ান্টগুলোর সাথে পাল্লা দিচ্ছে।

বর্তমানে চীন ভারী যন্ত্রপাতি ও হাই টেক ইন্ডাস্ট্রির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ২০১৮ সালে টেসলার সিইও ইলন মাস্ক চীনে কোম্পানিটির ৩য় গিগা ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শেংহাই রিজিওনাল সরকারের সাথে একটি চুক্তি করেন। এছাড়া চীন ফাইটার জেটস, এয়ার প্লেনস, রকেটস, রেলওয়েস এবং অন্যান্য হাইটেক হেভি ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইটেম প্রস্তুত করছে।

২০১৯ সালে Research and Development এর পিছনে ৩০০ বিলিয়ন ডলার বা জিডিপির প্রায় ২.২% খরচ করেছে। সম্প্রতি গ্লোবাল R&D বিনিয়োগের প্রায় ২০% যোগান করছে চীন। ২০১৯ সালে গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং প্রোডাকশন এর ২৮.৭% করেছে চীন। এমনকি করোনা মহামারীকালীন সময়েও ২০২০ সালে চীন সর্বোচ্চ বৈদেশিক বিনিয়োগ গ্রহণ করেছে।

Statista এর একটি তথ্যসূত্রে, ২০২০ সালে চীনের জিডিপির পরিমাণ ছিলো প্রায় ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার যা ২০২১ সালে প্রায় ১৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে যা চীনকে আমেরিকার পরে বিশ্বের ২য় সর্ববৃহৎ ইকোনমি করে তুলেছে।