Daily Bangladesh
  1. অর্থনীতি
  2. আন্তর্জাতিক
  3. খেলাধুলা
  4. জাতীয়
  5. তথ্যপ্রযুক্তি
  6. পাঠক মতামত
  7. ফিচার
  8. বিজ্ঞান ও গবেষণা
  9. বিনোদন
  10. ব্যবসা ও বানিজ্য
  11. রাজনীতি
  12. লাইফস্টাইল
  13. শিক্ষা
  14. সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  15. স্থানীয় সংবাদ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাংলাদেশের নতুন বিপদগুলো কি গ্লাসগো শুনবে

Link Copied!

মানবসমাজ বৈশ্বিক জলবায়ুর ভারসাম্যহীনতা নষ্টের জন্য এককভাবে দায়ী, সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। জাতিসংঘ গঠিত আন্তসরকার জলবায়ু প্যানেলের আগস্টে প্রকাশিত ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নসংক্রান্ত যেসব তথ্য উঠে এসেছে, সেগুলো খুবই বিপজ্জনক। অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার না কমালে বা তাপমাত্রার ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতি রোধে বিশ্ববাসী এখনই ঐকমত্যে না আসতে পারলে বর্তমান শতাব্দীর শেষে বাসযোগ্য ও জলবায়ুসহিষ্ণু পৃথিবীর চিন্তা অনেকটাই অকল্পনীয়। আর ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য ‘চমৎকার’ ও ‘শেষ’ সুযোগ হিসেবে অনেকেই ৩১ অক্টোবর থেকে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিতব্য কপ-২৬ সম্মেলনকে দেখছেন।

তবে একমত হওয়ার পথ যে খুবই বন্ধুর, এর কিছু আলামত ইতিমধ্যে জানা গেছে গণমাধ্যমের বদৌলতে। ফলে, মানবজাতির কল্যাণে নির্মিত জাতিসংঘ ও অঙ্গসংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত হুংকার ও হুঁশিয়ারি দিয়েই যাচ্ছে। আরও শঙ্কার বিষয় হচ্ছে স্বাগতিক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সম্মেলনের সাফল্য নিয়ে রাজ্যের হতাশা।

মানুষের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের দরুন বছরে ৫১ বিলিয়ন টন গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে যোগ হয়। ওই নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য, মাত্র শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ। তবে ক্ষতিগ্রস্তের দিক থেকে সামনের কাতারে। ধরিত্রীর জলবায়ু সহনীয় রাখতে উন্নত দেশগুলোর আচরণ প্রথম থেকেই বাংলা ‘চোর-পুলিশ’ প্রবাদের মতো। যেমন পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে তাদের দায় সবচেয়ে বেশি অথচ তাপমাত্রা হ্রাসে প্রায়ই তারা উন্নয়নশীল ও গরিব দেশগুলোকে বিভিন্ন পন্থা চাপিয়ে দেয়। তাই ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সঙ্গে নতুন উপসর্গ হচ্ছে জলবায়ু সংকট। যেহেতু নিজের সুরক্ষা নিজেদেরই দিতে হবে, সেহেতু বৈশ্বিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে অনেক কিছু মেনে নিতে হয় বা হচ্ছে।

গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে আমাদের অবদান ক্ষুদ্র হলেও আন্তর্জাতিক চাহিদাপত্রে ২০১৫ সালে নিঃসরণ হ্রাসে তৈরি হয় জাতীয়ভাবে নিরূপিত অবদান বা এনডিসি। ২০২০ সালে হয় বর্ধিত এনডিসি। বলা বাহুল্য, আমাদের এনডিসিও উচ্চাকাঙ্ক্ষী, অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় নির্গমন ১৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যার মধ্যে নিঃশর্তভাবে কমাতে হবে ৫ শতাংশ আর বাকিটা শর্তসাপেক্ষ। যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর দেশগুলোকে বিভিন্ন কারণে ও কূটকৌশলে ধরাশায়ী করতে সুবিধা, সেহেতু উন্নত দেশগুলো যেকোনো বিষয়ে তাদের ওপর দায় চাপাতে সিদ্ধহস্ত। জলবায়ু সংকটও এর ব্যতিক্রম নয়, বরং আরও বেশি পরিপক্ব।

প্রতিবারই বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনের আগে ধরিত্রীর উষ্ণায়নে উন্নত দেশগুলোর দায় নিয়ে ব্যাপক আওয়াজ উচ্চারিত হয়, সম্মেলন শেষ হলে লাটিমের মতো আগের অবস্থায় পদার্পণ। যেমন ২০১৫ সালে সম্পাদিত প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুসারে পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে উন্নত দেশগুলো ২০২০ সাল থেকে উন্নয়নশীল বিশ্বকে ১০০ বিলিয়ন ডলার তহবিল ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও আদতে এটা ভালোভাবেই ধাক্কা খেয়েছে। তাই আমাদের মতো দেশগুলো নির্গমন হ্রাসে খুব বেশি সহযোগিতা পায় না, কিন্তু দিনের শেষে সব দোষ আমাদের; যেন ‘মিকি-মাউস’-এর খেলা!

যাক, পরিবর্তিত জলবায়ুতে বাংলাদেশের কোন খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সে বিষয়ে কমবেশি সবাই জানি। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে, ৩০ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে ইত্যাদি। জলবায়ুর রূপান্তরে যেসব প্রভাব আমরা জানি না বা কখনো অনুমানেও আসেনি, সেগুলোর বিস্তার কিন্তু এখন দৃশ্যমান। এমন অনেক বিষয় থাকলেও গুরুত্ববহ কিছু বিষয়ে নজর দেওয়া যাক। প্রথমেই আসি বড় শহরগুলোর উষ্ণায়ন নিয়ে। আমাদের ও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের গবেষণায় এসেছে, নগরগুলো দিন দিন মাত্রাতিরিক্ত হারে উত্তপ্ত হচ্ছে। এ কারণে মানুষের বহু শ্রমঘণ্টা নষ্টের সঙ্গে দাবদাহে মৃত্যুর শঙ্কাও বাড়ছে। এ অবস্থার জন্য অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ক্রমবর্ধমান শহুরে জনসংখ্যার দায় ৮০ ভাগ আর বাকিটা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের। কিন্তু জনস্রোত কেন শহরমুখী? মূলত, জলবায়ুর বিরূপ আচরণে বিভিন্ন এলাকায় জীবিকা নির্বাহের উপায়গুলো হ্রাস পাচ্ছে, ফলে মানুষ নগরমুখী। সুতরাং, নগরের উষ্ণায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।

অন্যদিকে, ডেঙ্গুর মতো প্রাণঘাতী রোগের বিস্তারেও উষ্ণায়নের প্রভাব পরিষ্কার। আবার শুষ্ক মৌসুমে আন্তসীমান্ত বায়ুদূষণের দরুন বাড়ছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ। এ কারণে পরিবারসহ রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ার সঙ্গে ব্যক্তির কর্মক্ষমতা ও উৎপাদন কমছে। সমুদ্রও কিন্তু ভূমির মতো উত্তপ্ত হচ্ছে। আর ভূমি ও সমুদ্রের তাপমাত্রার তারতম্য কমে আসায় ধীরে ধীরে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলস্বরূপ, বাড়ছে ভারী ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, সৃষ্টি হচ্ছে নিত্যনতুন দুর্যোগের। বড়-মাঝারি শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনা, আশু সমাধান নেই, তবে বাগাড়ম্বরতার কমতি নেই।

একসময় দেশে বড় বা নিয়মিত বন্যার সময় জানা ছিল। জলবায়ুর রূপান্তরে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বন্যার অনিয়মিতকরণে জীবনজীবিকা, কৃষিসহ নদীভাঙনে বিরূপ প্রভাব দিবালোকের মতো পরিষ্কার। যেমন গত সপ্তাহে তিস্তায় হঠাৎ বন্যা আমাদের জন্য অবশ্যই অশনিসংকেত। ভূমির উচ্চতা কম হওয়ায় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় উপকূলে লবণাক্ততার বিস্তারে জনজীবন দুর্বিষহ। একদিকে সুপেয় পানির অভাব, অন্যদিকে বিভিন্ন রোগবালাইয়ের প্রকোপ। লবণাক্ততা বাড়লে কৃষিক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি যে প্রভাব পড়বে, তা মোকাবিলার উপায় কী? অনেকেই লবণসহিষ্ণু ভ্যারাইটির কথা বলবেন, কিন্তু মাটি একবার লবণাক্ত হয়ে গেলে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা পাহাড়সম কাজ।

উপরিউক্ত ইস্যুগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব অনস্বীকার্য। এর মধ্যে কিছু বিষয়ে নিজস্ব সক্ষমতা দিয়ে মোকাবিলা সম্ভব, আর কিছু ক্ষেত্রে দরকার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। যেমন: নগরের উষ্ণায়ন, জলাবদ্ধতা বা জনস্বাস্থ্যের বিষয়গুলো দেশের জলবায়ু ও জননীতিতে কি বিধৃত আছে? না থাকলে তা দ্রুত জননীতির আওতায় আনা উচিত। তবে তা হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক। জলবায়ু রূপান্তর মোকাবিলায় স্থানীয় উদ্ভাবনের সঙ্গে সুচারু পারিসরিক পরিকল্পনা অত্যাবশ্যক। অন্যথায় যেকোনো কর্মপরিকল্পনাই ব্যর্থ হতে পারে। আবার গত সপ্তাহের তিস্তার মতো হঠাৎ বন্যা ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য। অন্যদিকে, জলবায়ুজনিত নেতিবাচক অনেক প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা ব্যতীত উত্তরণ সম্ভব নয়।

এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন। বায়বীয় প্রমাণের ভিত্তিতে চিৎকার-চেঁচামেচিতে খুব লাভ আগেও হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। মনে রাখতে হবে, উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক উপাত্ত হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ঘায়েল করার প্রধান অস্ত্র। আর আমাদের দেশে বিশ্বাসযোগ্য উপাত্তের ঘাটতি বহুকাল ধরেই সর্বজনবিদিত। সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অকাট্য প্রমাণ থাকলে তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো যায়। নিজেদের অধিকার আদায়েও উন্নত দেশগুলোকে চাপ প্রয়োগ সম্ভব।

এখন কথা হচ্ছে, গ্লাসগোতে কি নতুন এই বিপদগুলো উচ্চারিত হবে? নাকি চর্বিত চর্বণই চলবে? বাংলাদেশকে যাঁরা প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাঁদের দায়িত্ব নতুন বিপদগুলো সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে অবহিত করা। উন্নত অর্থনীতির জনগোষ্ঠীর বিলাসী জীবনযাপনের বলি আমাদের গরিব মানুষ—এ কথা কি বিশ্বনেতৃত্বের কানে দিতে পারবেন আমাদের প্রতিনিধিরা? নাকি প্রতিবারের মতো ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসির গল্প নিয়েই ফিরে আসবেন?

আশরাফ দেওয়ান অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেসের গবেষক।