Daily Bangladesh
  1. অর্থনীতি
  2. আন্তর্জাতিক
  3. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  4. খেলাধুলা
  5. জাতীয়
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. পাঠক মতামত
  8. ফিচার
  9. বিজ্ঞান ও গবেষণা
  10. বিনোদন
  11. ব্যবসা ও বানিজ্য
  12. রাজনীতি
  13. লাইফস্টাইল
  14. শিক্ষা
  15. সাহিত্য ও সংস্কৃতি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ডার্ক ওয়েব: ইন্টারনেট দুনিয়ার এক অন্ধকার জগৎ

Link Copied!

ডার্ক ওয়েবঃ বর্তমান প্রজন্ম পৃথিবীতে আসার পর থেকেই ইন্টারনেট প্রযুক্তি এবং তা ব্যবহারকারী বিভিন্ন ডিভাইস বা যন্ত্র এর মাঝে বসবাস করছে। কিন্তু পরিস্থিতি সবসময় এমন ছিলনা। গত শতকের ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী তাদের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন সেনাঘাঁটির কম্পিউটারগুলো পরস্পরের সাথে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আবিষ্কারের দায়িত্ব দেয়া হয় ‘এডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি‘ নামক একটি সরকারি সংস্থাকে। সংক্ষেপে ‘ARPA’ নামে পরিচিত এই সংস্থাটির উদ্ভাবিত সংযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করে গত শতকের সত্তরের দশক নাগাদ নিজেদের সেনা, বিমান এবং নৌঘাঁটি কম্পিউটারগুলো একটি নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র। উদ্ভাবনকারী সংস্থা নামানুসারে এই নেটওয়ার্কের নাম দেয়া হয় ‘আরপানেট’।

এরপর ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সাইন্স ফাউন্ডেশনকে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয়। এরপর এই প্রযুক্তিটি ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়া শুরু করে। নব্বইয়ের দশক নাগাদ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান জনসাধারণের জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিন্ন একটি কমার্শিয়াল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। কালের পরিক্রমায় বিশ্ব জুড়ে বিস্তৃত এই নেটওয়ার্কটি ইন্টারনেট হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠে।

বর্তমানে বহুল প্রচলিত এই সেবার গ্রাহক সংখ্যা ২০০৫ সালেও ছিল বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা মাত্র ১৬ ভাগ। ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স ইউনিয়ন এর তথ্য অনুযায়ী পরের ১৫ বছর সংখ্যা বেড়ে ২০১৯ সাল নাগাদ তা বিশ্ব জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৫৪ ভাগ এসে দাঁড়িয়েছে। তবে ইন্টারনেটের অন্ধকার দিক সম্পর্কে অনেক ব্যবহারকারী কিছু জানেন না। আজ ইন্টারনেটের অন্ধকার দিকটি সম্পর্কে আপনাদের বিস্তারিত জানাবো।

ইন্টারনেট সেবাটির কারণে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক অভিনব অধ্যায়ের সূচনা হয়। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নিমিষের মধ্যে যোগাযোগ করা সম্ভব। কিন্তু এই যোগাযোগের উৎস এবং গন্তব্য সম্পর্কে সব তথ্য সংযুক্ত থাকায় আগ্রহী ব্যক্তির পক্ষে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর পরিচয় উদঘাটন করা খুবই সহজ কাজে পরিণত হয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সংবেদনশীল এবং গোপনীয় তথ্য আদান প্রদানের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

এই সংকট মোকাবেলায় মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষণা সংস্থা ‘নেভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি’কে নতুন এক ধরনের নেটওয়ার্ক তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়। সংক্ষেপে ‘NRL’ নামে পরিচিত এই সংস্থাটি অনিয়ন রাউটিং (Onion Routing) শীর্ষক একটি নেটওয়ার্ক আবিষ্কার করে। এই নেটওয়ার্কে যোগাযোগের সময় মাঝপথে উৎস বা গন্তব্য সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা সম্ভব হয় না। এর কারণ এই নেটওয়ার্কে যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেটের মত সরাসরি সংযোগ এর বদলে একটি ওভারলে নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়।

ওভারলে নেটওয়ার্কেই মূলত দুই পক্ষের যোগাযোগে সাধারণ ইন্টারনেটের ভৌত সংযোগ এর উপর একটি ভার্চুয়াল বা পরাবাস্তব সংযোগ স্থাপন করা হয়। আমরা ইন্টারনেটে যে ওয়েবসাইট গুলো দেখতে পাই তা সার্ফেস ওয়েব (Surface Web) নামে পরিচিত। এর বিপরীতে এই অনিয়ন রাউটিং (Onion Routing) প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে ওয়েব সাইটগুলো ভিজিট করতে হয় তার নাম রাখা হয়েছে ডার্ক নেট বা ডার্ক ওয়েব। এই ডার্ক নেটের ওয়েব সাইটগুলো ভিজিট করতে চাইলে আপনার হয় বিশেষ কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হবে অথবা ওয়েবসাইটটির একদিন পর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন পড়বে।

ডার্ক ওয়েবের ইতিহাস

এতক্ষণের বর্ণনা আপনার কাছে বেশি জটিল মনে হলে সহজ কথায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি সামরিক গবেষণা কেন্দ্র বিশেষ এক ধরনের নেটওয়ার্ক উদ্ভাবন করে যেখানে ব্যবহারকারীর পরিচয় এবং ভৌগলিক অবস্থান সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকবে এবং সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স (CIA) এর মত সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাজের সুবিধার্থে এই প্রযুক্তির উদ্ভাবন করা হয়েছিল।

কিন্তু অচিরেই এর উদ্ভাবকরা বুঝতে পেরেছিলেন অনিয়ন রাউটিং প্রযুক্তিটি জনসাধারণকেও ব্যবহারের সুযোগ না দিলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সদস্যদের জন্য এটি তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলবে। এই উদ্ভাবকদের একজন রজার ডিংগেল্ডাইন, যিনি ২০০৪ সালে অনুষ্ঠিত এক নিরাপত্তা সম্মেলনে তাদের সেই উপলব্ধি সম্পর্কে বলেন। প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলে এই নেটওয়ার্ক থেকে কেউ জনসাধারনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে যোগাযোগকারী নির্ঘাত সিআইএ- এর এজেন্ট। এই পরিস্থিতি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার অনিয়ন রাউটিং প্রযুক্তিটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।

ওপেনসোর্স লাইসেন্স এর মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া প্রযুক্তিটি TOR নামে পরিচিত। The Onion Router শব্দটিগুলো ব্যবহার করে এই নামটি তৈরি হয়েছে। এই সফটওয়্যারটি ডাউনলোড করে আপনি বিশ্বজুড়ে অনিয়ন রাউটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডার্ক ওয়েব সাইটগুলো ভিজিট করতে পারবেন।

ডার্কনেট এর জন্য এই টোরের পর বর্তমানে একাধিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। আগেই জেনেছি একত্রে নেটওয়ার্কগুলো ডার্ক ওয়েব নামে পরিচিত। ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি ওয়েবসাইটকে হয় সার্ফেস ওয়েব অথবা ডিপওয়েব হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই দুই ধরনের ওয়েবসাইটের মধ্যে একমাত্র তফাৎটি হলো সার্ফেস ওয়েব সাইটগুলো গুগলের মতো বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনের পক্ষে তালিকাভুক্ত এবং প্রদর্শন করা সম্ভব হয়। এর বিপরীতে ডিপওয়েবের কনটেন্টগুলো কোন সার্চ ইঞ্জিনের পক্ষে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় না। অর্থাৎ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনলাইন লেনদেনের ওয়েবসাইট থেকে শুরু করে নেটফ্লিক্স এবং আপনার জিমেইল বা হট মেইলের ইনবক্সটিও ডিপ ওয়েবের অংশ।

ধারণা করা হয় এই ডিপ ওয়েবে থাকা কন্টেন্ট এর পরিমাণ সারফেস ওয়েবে তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু কোন সার্চ ইঞ্জিনের পক্ষে এই কন্টেন্ট গুলোর তালিকা করা সম্ভব না হওয়ায় এর পরিমাণ নির্ণয় করা প্রায় অসাধ্য বলতে হবে। ২০ বছর আগে ২০০১ সালে চালানো এক গবেষণা পত্রে অনুমান করা হয় তার তুলনায় কমপক্ষে পাঁচশ গুণ বেশি কন্টেন্ট রয়েছে। সর্বোপরি এই ডিপ ওয়েবের অন্তর্ভুক্ত সাইটগুলো ভিজিট করতে আপনার বিশেষ কোন সফটওয়্যার বা অ্যাডমিনের অনুমোদন প্রয়োজন পড়বে সেগুলোকে ডার্ক ওয়েব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

ডার্ক ওয়েবের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেটওয়ার্ক TOR ব্যবহার করে আপনি কি কি সেবা পেতে পারেন তার সম্পর্কে ধারণা নেয়া যাক। আগেই জানিয়েছি এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইমেইল যোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্রাউজিং এর মত আপনার দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারবেন। কিন্তু এর জন্য আপনি যে লিঙ্ক গুলো ক্লিক করবেন তার শেষে আমাদের পরিচিত .com, .net বা .org এর বদলে .onion শব্দটি লেখা থাকবে। গুগল ক্রোম বা মজিলা ফায়ারফক্সের মত সাধারন ব্রাউজার ব্যবহার করে .onion লিংক গুলো ভিজিট করা সম্ভব হবে না। এর জন্য আপনাকে টোর ব্রাউজারের (TOR Browser) মত বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হবে।

সেখানে নিচের ছবির প্রথম লিংকটি টাইপ করলে আপনি ডার্ক ওয়েবের একটি সাইটে প্রবেশ করতে সক্ষম হবেন। জেনে অবাক হবেন তুমুল জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেরও ডার্ক ওয়েবের ব্যবহারযোগ্য একটি লিংক (ছবির ২য় লিংকটি) রয়েছে। এছাড়া ডাকডাকগো (DuckDuck Go) নামক একটি সার্চ ইঞ্জিনও ডার্ক ওয়েবে বেশ জনপ্রিয়।

ডার্ক ওয়েব

সমস্যা হলো নাম পরিচয় গোপন রাখতে আগ্রহী সাধারন মানুষ এবং সরকারি গোয়েন্দাদের পাশাপাশি অপরাধ জগতের সদস্যদের কাছে এই টোর নেটওয়ার্ক বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাটপার এবং জালিয়াত থেকে শুরু করে ভাড়াটে খুনিদের মতো জঘন্য মানুষরাও তাদের সম্ভাব্য মক্কেলদের সাথে সংযোগ স্থাপনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

যেমন ধরুন এই ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে ২০১১ সাল থেকে নিম্নমানের ওষুধ অনলাইনে অবৈধভাবে বাজারজাত শুরু করে সিল্করোড শীর্ষক একটি ওয়েবসাইট। ২০১৩ সালে FBI এর অভিযানে বন্ধ হবার আগেই এই অবৈধ ব্যবসায় উপার্জন হয়েছিল ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। FBI এর অভিযান ডার্ক ওয়েব সম্পর্কে জনসাধারণকে আরো বেশি কৌতুহলী করে তোলে। ফলে জনপ্রিয়তা কমার বদলে উল্টো বেড়ে গিয়েছিল। এর কয়েক মাসের মাথায় ডার্ক ওয়েবে সিল্ক রোড ২.০ নামের নতুন একটি ওয়েবসাইটের আবির্ভাব ঘটে। ২০১৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিস্কো থেকে এই ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতাকে আটক করে FBI। সেই দফায় মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই ডার্ক ওয়েবে সিল্ক রোড ৩.০ উন্মুক্ত হয়েছিল।

আরো উদ্বেকজনক তথ্য হচ্ছে অবৈধ ওষুধের ব্যবসা ডার্ক ওয়েবে চলমান অসংখ্য অবৈধ ব্যবসার একটি অংশ কেবল। এছাড়া আরও যে ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের জন্য এই ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করা হয় তার বর্ণনা শুনলে আপনি শিউরে উঠতে বাধ্য হবেন। এর মধ্যে প্রথমে রয়েছে রেডরুম নামে পরিচিত এক ধরনের ওয়েবসাইট। এই সাইটগুলোই ইচ্ছুক এবং অনিচ্ছুক মানুষদের উপর নির্মম অত্যাচার চালানোর ভিডিও অর্থের বিনিময়ে দেখা যায়। হাত-পা, মুখ-চোখ বাধা অসহায় মানুষগুলোকে কেটে ছিড়ে রক্তাক্ত করা সেই ভিডিওগুলো দেখে পৈচাশিক আনন্দ উপভোগ করে বিকৃত মানসিকতার দর্শকরা। এছাড়া যৌন কর্মকাণ্ডের নামে শিশুদের উপর পাশবিক নির্যাতনের ভিডিও দেখারও একাধিক ওয়েবসাইট রয়েছে ডার্কওয়েবে।

FBI প্রায় অভিযান চালিয়ে এই ধরনের অবৈধ কর্মকান্ড ভেস্তে দেয়। সম্প্রতি তারা ললিতা সিটি এবং প্লেপেন শীর্ষক এমন দুটি ওয়েবসাইটের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। ২০১৬ সালে ডার্ক ওয়েবের ২৭২৩টি সাইটের উপর একটি জরিপ চালানো হয়। তাতে দেখা যায় এর মধ্যে ১৫৪৭টি তেই বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড চলছে। অর্থাৎ অবৈধ ওয়েবসাইটের সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ বা তার অর্ধেকের বেশি। তবে টোর ব্রাউজার ব্যবহারকারীদের শতকরা মাত্র ৩ থেকে ৬ ভাগ এই অবৈধ সাইট গুলো ভিজিট করছেন অর্থাৎ শতকরা ৯৫ ভাগ এর বেশি টোর ব্রাউজার ব্যবহারকারী শুধু নিজের নাম পরিচয় গোপন রাখতে এটি ব্যবহার করছেন।